শতায়ু হোন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নাঈমুল ইসলাম খান




শতায়ু হোন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নাঈমুল ইসলাম খান

মুনজের আহমদ চৌধুরী
>>>>>>>
নৈতিকতা আর সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতায় নৈতিকতার দূরত্বের এই সময়ে প্রায়ই স্মরণ করি প্রিয় শিক্ষককে। শ্রদ্ধেয় নাঈমুল ইসলাম খান। সরল সাংবাদিকতার বিরল শিক্ষক তিনি। আমার মতো অনেকের, যাদের সাংবাদিকতায় কিছু স্বল্পকালীন কর্মশালা আর ট্রেনিং ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের অনেকেই আজ যতটুকু শিখতে পেরেছি সাংবাদিকতায়, সবই তাঁর কারণে। যদিও দ্বিধাহীনভাবেই স্বীকার করি, এতটুকুন পথে এখনো নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে দাবি করবার মতো কিছু শিখতে পারিনি। নিজেকে এখনো সংবাদকর্মী হিসেবেই মনে করি। ঢাকার বাইরে, মফস্বলী সাংবাদিকতার মানুষ হলেও ঢাকায় যেদিনই যেতাম, সকালবেলা গিয়ে বসে থাকতাম বাংলামোটরে আমাদের সময়ের অফিসে। উদ্দেশ্য, প্রতি সকালে রিপোর্টারদের নিয়ে নাঈমুল ইসলাম খানের প্রতিদিনের মিটিংয়ের কথাগুলো শোনা। গিয়ে বসে থাকতাম পেছনের একটা চেয়ারে। তাঁর প্রতি সকালের কথাগুলো ধারণ করার মধ্য দিয়ে আজকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় অনেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ব্যক্তির বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতাকে বর্জন করা, ইতিবাচক সাংবাদিকতা, বক্তব্যবিহীন গল্পের সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করা, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নতুন ধারার প্রবর্তক এ মানুষটির কাছ থেকে শেখা। ভুল কোন সংবাদ অনাকাংখিতভাবে প্রকাশিত হলে নির্দ্বিধায় তা স্বীকার করে নেওয়া, প্রকাশিত সংবাদের সম গুরুত্বে সংবাদটির প্রতিবাদ প্রকাশ, এগুলো তার-ই শিক্ষা। প্রতিদিনের ভালো নিউজের জন্য তখন পুরস্কার দিত আমাদের সময়। দিনের সেরা খবরের জন্য কয়েকদিন পরপর বেশ কটি আমার পুরস্কার জমে যেত শ্রদ্বেয় দুলাল ভাইয়ের কাছে। সাংবাদিকতার শিক্ষিত শিক্ষক এ মানুষটি আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ আর আমাদের সময় এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নিঃসন্দেহে সৃষ্টি করেছেন নতুন এক সময়ের, আধুনিক অধ্যায়ের। সময়ের চেয়ে একধাপ এগিয়ে থাকা সাংবাদিক গড়ার কারিগর এ মানুষটির হাত ধরেই গড়ে উঠেছে আমাদের এখনকার সাংবাদিতার একটি বড়ো প্রজন্ম। যদিও আমরা অনেকেই আমাদের অস্বীকার প্রবণতার মধ্য দিয়ে নিজেকে জাহির করার বাসনায় ব্যস্তৃ!
মেধাবী, রুচিবান, আধুনিক এই সম্পাদক বিশ্ব সাংবাদিকতার নতুনত্ব আর নিরীক্ষাকে সব সময়ই ধারণ করেছেন। কর্পোরেট সাংবাদিকতার এই যাপিত সময়ে দু-টাকার আর আট পৃষ্ঠায় কিভাবে একটি পুর্ণাঙ্গ দৈনিককে দেশসেরা করা যায়, কীভাবে তা দেশের শীর্ষ প্রচার সংখ্যার দৈনিকে পরিণত করা যায়, সেটি করে দেখিয়েছেন স্বপ্নবাজ এ মানুষটি। আর এই অর্জনগুলোই তাকে পরিণত করেছে, পাঠক হৃদয়ে অধিষ্ঠিত করেছে আমাদের সাংবাদিকতার সময়ের নন্দিত নায়ককে। টক-শোতে তারঁ সাহসী কথামালা শ্রোতাদের দিয়েছে চিন্তার নবতর খোরাক। পাঠক কী চায়, সেটি তিনি জানেন। শিল্পবোধ, সংযম, দায়িত্ববোধ আর সাহস দিয়ে তিনি আমার আমাদের মতো অনেককেই সাংবাদিতার বিশাল প্রাঙ্গনে হাঁটতে শিখিয়েছেন। মৗলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দীর্ঘদিন আমাদের সময়ে সিলেটজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় অনুভব করেছি, কতটা তিনি বিশ্বস্ত তৃণমূল থেকে তৃণমূলে পাঠকের কাছে। লন্ডনে আসার আগে তিনিই শ্রদ্ধাভাজন রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরীর সাথে কথা বলে জুটিয়ে রেখেছেন আমার জন্য সাংবাদিকতার একটা চাকরি। যদিও লন্ডনে আসার আগে বিষয়টি আমার জানা ছিল না।
লন্ডনে এসেও পাশে বসে পিতৃসম ¯েœহে বুঝিয়েছেন, সাংবাদিকতার আর্থিক দৈন্যে যেন আমার সংসার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; সে নিগুঢ় বাস্তবতার কথাটিও। আজো যখন কথা বলি টেলিফোনে, অন্তত একটি বাক্য বলেও তিনি শেখানোর চেষ্টা করেন সাংবাদিকতার। তাই বুকের ভেতর থেকে সগৌরবে স্বীকার করি, সাংবাদিকতার এ টুকু যাত্রায় যতটুকু শিখতে পেরেছি সবই তাঁর কারণে, তাঁরই বদান্যতায়। আর আমার আরেক শিক্ষক দুলাল আহমদ চৌধুরী এবং লন্ডনে আমার অভিভাবক চ্যানেল আই ইউরোপের কর্নধার রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরীর কাছেও শিখেছি, শিখছি। নাঈমুল ইসলাম খানের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নতুন কোন পরিকল্পনাকে বাস্তবতা দেবার সক্ষমতায় তিনি কিভাবে যেন আমার মত শত-সহ¯্র তরুণের বুকের ভেতরজুড়ে আদর্শ আর আইডল হিসেবে অধিষ্ঠিত আপন আলোয়, সেটি টের পাই অনুভবের অনুরণনে। আপন লক্ষ্যে স্থির, যুক্তিবাদী আর তারুণ্যকে সব সময়ই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া উদার এ মানুষটিকে নিয়ে প্রায়ই লিখবার তাগিদ আসে ভেতর থেকে। ভাবি, কোথা থেকে শুরু করবো। সেই ২০০৭ থেকে আজ ২০১৬।
বহু শাসন করেছেন, বকা দিয়েছেন, সেগুলোই নিঃসন্দেহে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর মধ্যে জ্বলজ্বল করে থাকবে আমৃত্যু। আজ প্রিয় এ শিক্ষকের জন্মদিনে বলি, তাঁর উপর আমাদের সে অর্থে মিডিয়ার আলো নেই, তবু তিনি তারঁ আপন আলোয় আলোকিত করে চলেছেন আমাদের সাংবাদিকতাকে, দেশকে।
ভাল থাকবেন স্যার, আপনার আপন আলোয়ৃ।
মুনজের আহমদ চৌধুরী-বার্তা সম্পাদক চ্যানেল আই ইউরোপ