পর্যটন শিল্পেও এগিয়ে আসছে নারী




পর্যটন শিল্পেও এগিয়ে আসছে নারী

স্টার বাংলা ডেস্ক: ভারতে ঘুরতে এসে একদল ব্রিটিশ পর্যটকের দারুণ অভিজ্ঞতা হয়। দিল্লিতে ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন করে তাদের বেশ লাগে। যেমন দিল্লির ঐতিহাসিক জামে সমজিদ। ভারতের অন্যতম বড় এই সমজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে নির্মিত সমজিদটির সৌন্দর্য এখনও অটুট রয়েছে। মোঘল আমলে অর্থাৎ ১৭ শতকের এই সমজিদটি নির্মাণে কাজ করেছিল পাঁচ সহস্রাধিক শ্রমিক।

অবশ্য সুন্দর স্থাপনাগুলোর বাইরের চিত্র ভিন্ন। মানুষের কোলাহল, হকারদের চিৎকার, যানবাহনের চাপ দেখে মোঘল আমলের অনুভূতিগুলো কিছুটা ফিকে হয়ে আসে। তবে সব স্থানের চিত্র যে একরকম তা নয়। ব্রিটিশ পর্যটক দলটি অবশ্য সেসব নিয়ে চিন্তিত নয়। তাদের লক্ষ্য দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন।

দিল্লির পরবর্তী দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার আগে তারা আসেন জনবহুল বাজার চাঁদনি চক’এ। পুরনো বাজারটি এখনও যেন সেই আগের ব্যস্ততাই ধরে রেখেছে। এখানে কিছু দোকান রয়েছে যারা দীর্ঘ ৮০ বছর, অর্থাৎ বাজার বসার গোড়া থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।

স্থানটি যে পর্যটকদের বেশিক্ষণ ভালো লাগবে না তা সানা ভালোই বুঝতে পারছিলেন। তাই যত দ্রুত সম্ভব চেষ্টা করছিলেন পরবর্তী গন্তব্যস্থলে যেতে। এজন্যে তিনি কয়েকটি সাইকেল রিকসার চালকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরদাম করছিলেন। কেননা, পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্বটা যে তার উপরই বর্তেছে। অনেকদিন ধরেই তিনি পর্যটকদের গাইডের কাজ করে আসছেন।

পশ্চিমে বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিষয়টি এখনও তা নয়! বিশেষ করে ভারতের মত দেশে যেখানে, নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ব্রিটিশ পর্যটকেরা তাই সানা সম্পর্কে কিছুটা কৌতূহলী হয়ে ওঠেন।

জাতিসংঘের লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে ১৮৮ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৩০ তম। যেখানে নারীরা এখনও ঘরেই নিরাপত্তা পান না, সেখানে ভিনদেশী অপরিচিত মানুষদের নিয়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো সহজ কথা নয়! নারীদের অভিভাবকেরাও রাজি হন না এমন কাজে অনুমতি কিংবা উৎসাহ দিতে।

অবশ্য ইনট্রাপিড ট্রাভেল নামের একটি ব্রিটিশ পর্যটক সংস্থা এই খাতে ভারতের নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে এগিয়ে এসেছে। পর্যটন খাতে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে সংস্থাটি গত বছর উদ্যোগটি হাতে নেয়। পর্যটন শিল্পে গাইড হিসেবে যাতে নারীরা এগিয়ে আসে সেজন্যে তারা নিয়োগ এবং বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

যদিও উদ্যোগটি যে সহজ ছিল তা নয়। সংস্থাটির প্রধান জেমস থ্রর্নটন জানান, উদ্যোগের গোড়াতেই কাজের জন্য উপযুক্ত নারীদের খুঁজে পেতে তাদের বেগ পেতে হয়। এই উদ্যোগের কারণ হিসেবে তিনি জানান, তাদের কাছে যত পর্যটক আসেন তার ৬৭ ভাগই নারী। তারা গাইড হিসেবে নারীকেই চান। কিন্তু জেমস খেয়াল করে দেখেন, পথ প্রদর্শক হিসেবে তাদের কাছে ২০ ভাগ নারীও নেই। ফলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন পর্যটকদের চাহিদা পূরণেই জন্যই শুধু নয়, নারীদের ক্ষমতায়নের স্বার্থেই তিনি উদ্যোগটি নেবেন। ফলে গাইড হিসেবে নারীদের নিয়োগ দেয়া শুরু করেন তিনি। দিতে থাকেন বিশেষ প্রশিক্ষণ!

উদ্যোগটি দ্রুত না এগুলেও বর্তমানে সংস্থার ৬৭ জন গাইডের মধ্যে ১১ জন নারী রয়েছেন। সংস্থার সিইও’র মতে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে অনেক দূর যেতে হবে।

সানা’র প্রসঙ্গে জেমস থ্রর্নটন জানান, দলগত ভ্রমণকাজের জন্য প্রথমবার ভারতের উত্তরাঞ্চলে যখন তারা আসেন তখন সানা গাইডের কাজ করেন। প্রাণিবিদ্যায় পড়াশোনা করলেও সানা পর্যটন পেশাকেই বেশি পছন্দ করতেন। ২৯ বছর বয়সী সানা তাই একটি প্রতিষ্ঠানে ৪ বছর কাজ করলেও পরে তা ছেড়ে দেন।

সানা নিজেও বলেন, তার এই পেশাকে অভিভাবকেরাও ভালো চোখে দেখতেন না। তার নিরাপত্তা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন থাকতেন। সানা’র মা তো সম্পূর্ণ বিপক্ষে ছিলেন। তার শঙ্কা ছিল, আত্মীয় এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা জানতে পারলে না জানি কী ভাববে! দিন বদলালেও নারীদের সম্পর্কে বলতে গেলে সমাজের মনোভাব এখনও আগের মতই আছে। নারীদের জন্য যদি ৯টি পেশাকে তারা বেছে দেন তবে এর ৫টিই দেখা যাবে ঘর কিংবা গৃহস্থালি সম্পর্কিত কাজ।

ব্রিটিশ পর্যটক দলটি ঘুরতে ঘুরতে সানা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারেন। সানা জানান, প্রয়োজন হলেও পরিবারের চাপের কারণে সানা এখনও বাইরে রাত কাটাতে পারেন না। বিষয়টা এমন নয় যে, তার উপর বাড়ির মানুষের আস্থা নেই। মূল কারণটি হল, তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা। এছাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের অপবাদ থেকে রক্ষা পেতে তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না।

পথে সানা জানান, এখনও তার মা ভেবে অবাক হন কীভাবে সে পর্যটকদের নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে পুরুষ পর্যটকদের নিয়ে শঙ্কা তার এখনও কাটেনি। তবে সানা এই কাজে প্রবেশ করার পর দেখিয়ে দিয়েছে আত্মসম্মান বজায় রেখে পুরুষের মতই নারীরা যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারে। তাছাড়া সংসারে তুলনামূলক স্বচ্ছলতা দেখা দেয়ায় এখন বাড়ির মানুষেরাও বেশ খুশি।

সুত্র: দি গার্ডিয়ান