নিষিদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী লেখকদের বই!




নিষিদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী লেখকদের বই!

স্টার বাংলা নিউজ: মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তদের রচিত সব ধরনের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। ‘সমাজে শান্তিভঙ্গ, ধর্ম অবমাননা, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাস বিকৃতি’সহ বেশ কিছু অভিযোগ এনে এক বছরের মধ্যে দেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের রচিত বইয়ের প্রকাশনা ও বাজারজাত বন্ধের চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ে। তবে এ সিদ্ধান্তের পূর্ণ-বাস্তবায়ন আগামী মেয়াদ নাগাদ দেখা যাবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জামায়াত-শিবিরের পাঠ্যতালিকা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের রচিত বইও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাজার থেকে তুলে নিতে হবে অভিযুক্ত গ্রন্থগুলো। জামায়াত-শিবিরসহ উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা পড়েই মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। এতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক রচনা পড়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এসব বিবেচনা করে স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা নিষিদ্ধ করবে সরকার।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের লেখা গ্রন্থ সহজে খুঁজে বের করা গেলেও একাত্তরের বিতর্কিত লেখক-কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের রচিত গ্রন্থ-লেখা চিহ্নিত করা খানিকটা কঠিন হবে বলে মনে করছে একটি সূত্র। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-সম্পর্কিত গ্রন্থের সাহায্য নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি করারও পরিকল্পনা করছে সরকার। এই কমিটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লেখক, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকদের লেখা বের করবেন। এরপর উচ্চপর্যায়ের আরও একটি কমিটি যাছাই-বাছাই করে নিষিদ্ধের সুপারিশ করবে।

গোয়েন্দাসংস্থার একাধিক সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মানবতাবিরোধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে আইন করার কথা জানালেও প্রকাশনা নিষিদ্ধে নতুন আইনের কথা ভাবছে না সরকার।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘নতুন আইন করে প্রকাশনা বন্ধের ব্যাপারটি এখনও, ওই আঙ্গিকে দেখিনি। সেটা আমরা দেখব, এ রকম কথা, লেখা হয়ে গেছে। এ কারণে এটার গ্রহণযোগ্যতা, অগ্রহণযোগ্যতার যে বিষয়টি, সেটি জনগণ দেখবে। আইন করে তো এটা বন্ধ করা যায় না। যেটা লেখা হয়ে গেছে, সেটা বন্ধ করব কিভাবে।’

তবে বিষয়টি সরকারের চিন্তায় আছে এমন ইঙ্গিত মিলেছে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ’র বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘শুধু প্রকাশনা নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তসহ সব বিষয় নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এর বাস্তবায়ন দেখা যাবে।’

এর আগে গতবছরের ৯ জুন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। এটি বর্তমানে সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। এরপর ২২ আগস্ট সম্প্রচার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অপপ্রচার চালালে বা তাতে মদদ দিলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান রেখে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৬’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

সূত্রের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী লেখক-সাহিত্যিকদের গ্রন্থ এই দুই আইনের আলোকেও নিষিদ্ধ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনের পরই জানা যাবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া।

অসমর্থিত একটি সূত্রের দাবি, সরাসরি নিষিদ্ধ না করে অভিযুক্ত গ্রন্থগুলোর বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিতে পারে সরকারি দল। এক্ষেত্রে দল-সমর্থক কবি, বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকরা সক্রিয় হতে পারেন।

সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধীসহ স্বাধীনতাবিরোধী সক্রিয় লেখকদের গ্রন্থগুলো নতুন প্রজন্মের হাতে চলে আসায় মুক্তিযুদ্ধ ও ওই সময়কার পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তির উদ্রেক হয়। ছাত্র শিবিরসহ মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনগুলোয় বিভ্রান্তিমূলক বইয়ের লেখা পড়ে মিথ্যে তথ্য গলাধকরণ করানো হচ্ছে বিভিন্ন কর্মশালা, পাঠচক্রে। এটিকে বন্ধ করতে হলে গ্রন্থগুলোকে চিহ্নিত করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। এক্ষেত্রে গোয়েন্দারা গ্রন্থগুলোকে চিহ্নিতকরণ শুরু করবে পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লেখকদের সাহায্যে এটিকে ফলপ্রসূ রূপ দেওয়ার প্রস্তাব করবে গোয়েন্দা সংস্থাটি।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুল কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামানের লিখিত গ্রন্থগুলো প্রকাশ্যে বিক্রির বিষয়ে সরকার নিরুৎসাহিত করবে। এর বাইরে প্রয়াত লেখক, যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাবিরোধিতার অভিযোগ প্রমাণি হয়েছে, তাদের লিখিত গ্রন্থগুলোও পুনঃপ্রকাশে প্রকাশনীগুলোকে নিষেধ করে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘এ বিষয়ে আলোচনার পর আমি জানাতে পারব।’

এ ব্যাপারে লেখক-চিন্তাবিদ যতীন সরকার বলেন, ‘এ ধরনের চিন্তাভাবনা সরকারের থাকলে খুব ভালো। তবে তা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হব, এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও প্রগতিশীল লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পথ বের করতে হবে।’