মে দিবস : ইতিহাস ও বর্তমানের লড়াই




মে দিবস : ইতিহাস ও বর্তমানের লড়াই

শুভ কিবরিয়া:

সংগ্রামী দিনগুলোর যে তালিকা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে তার মধ্যে মে দিবস অনন্য। শ্রমজীবি মানুষের অধিকার আদায়ে এই দিন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আজ থেকে ১৩১ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ১৮৮৬ সালে হে মার্কেটের সামনে শ্রমিক আন্দোলনের সূত্র ধরে বিশ্বব্যাপী এই দিনে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে।

 

আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল এই দিনের মূল প্রতিপাদ্য। আট ঘন্টা শ্রম দিয়ে দিনের বাকি সময় ঘুম-শারীরিক বিশ্রামসহ  পারিবারিক-ব্যক্তিগত কাজের সময় চেয়ে শ্রমিকরা সেদিন আন্দোলনে নেমেছিলেন। শ্রমিকরা স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছিলেন। কেননা সুস্থ মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে গেলে দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করা উচিত নয়। দৈনিক কর্মঘন্টা আট ঘন্টা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়েই মে দিবসের এই লড়াইয়ের সূত্রপাত।

আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তখনকার শ্রমিকরা এই অধিকার আদায়ে সক্ষম হয়েছিলেন। ইউরোপ, আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের অধিকার। কিন্তু অনুন্নত দেশগুলোতে এটা করা সম্ভব হয়নি। অনুন্নত দেশগুলোর কলকারখানা মালিকরা কাগজে-কলমে আট ঘণ্টা কাজের দাবি মানলেও  বাস্তবে তা বিরাজ করে না। শ্রমিকরা আন্দালন করে এই দাবির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করলেও আমরা প্রতিদিন যেন আরও পেছনে হাঁটছি।

আজ শুধু শ্রমিকরা নন যারা বহু বেতনের কর্পোরেট কাজ করেন তারাও এখন আর এই নিয়ম মানতে পারেন না। সে হিসাবে মানুষকে স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে চিন্তা করা হয় না এখন। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি সাধারণ শ্রমিক তো বটেই, উঁচু বেতনের কর্পোরেট শ্রমিকের জীবন থেকেও স্বাভাবিক বিশ্রাম বিনোদন কেড়ে নিয়েছে। সে হিসাবে মে দিবসের তাৎপর্য আজ আর অনেকের জীবনেই সত্য বলে প্রতীয়মান হয় না।

আমাদের মতো দেশে শ্রমিকরা এক অর্থে মানবেতর জীবন যাপন করে থাকেন। যে জীবনকে সচল রাখতে জীবিকার প্রয়োজন সেই জীবিকাই খেয়ে ফেলে জীবনের পুরোটা।

০২.
বাংলাদেশের শিল্পখাত এখনো পূর্ণমাত্রায় বিকাশ লাভ করেনি। তাই আমাদের শ্রমিকরা কাজ করে প্রধানত এক অবিকশিত শিল্পখাতে। কেননা আমাদের সকল শিল্পখাত, সকল শ্রমঘনখাত এখনো পূর্ণ শ্রমআইন মেনে শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য সকল সুবিধাদি নিশ্চিত করে  বিকশিত হতে পারেনি। সেকারণেই এখানে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও শ্রমিকরা পায় না  ন্যায্য মজুরি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা সেভাবে নিশ্চিত হয়না। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যারা নিয়োজিত তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

আমরা স্মরণ করতে পারি রানা প্লাজার দুর্ঘটনার কথা। বলা হয় এটি ছিল শিল্প ইতিহাসের সর্ববৃহৎ প্রাণহানিপূর্ণ দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনায় নিহত, নিখোঁজ, শারীরিকভাবে পঙ্গু বা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা এখনো তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পায় নাই। যদিও দেশি-বিদেশি ক্রেতা-সামাজিক সংগঠন-সরকারের চাপে এই দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই আর্থিক অনুদান পেয়েছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে গার্মেন্ট খাত হচ্ছে সবচেয়ে আলোচিত ও শক্তিমান খাত। এখানে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। নারী শ্রমিকের সংখ্যাধিক্য রয়েছে এখানে।

বিদেশি ক্রেতা, বিদেশি সামাজিক সংগঠন সহ দেশি নানা সংগঠন, প্রাতষ্ঠানের গভীর দৃষ্টি রয়েছে এই খাতের ওপর। তারপরও এখানকার শ্রমিকরা এখনও ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনি অধিকার পাননি। যদিও ট্রেড ইউনিয়নের অপব্যবহার আমাদের অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিপথে ঠেলেছে অতীতে, তবুও এই অধিকার শ্রমিকদের ন্যায্যতা রক্ষার একমাত্র কবজ। সরকার ও মালিকপক্ষের চাপে গার্মেন্ট খাতের শ্রমিকরা এই অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত।

০৩.
বাংলাদেশে সকল পেশার শ্রমিকরা খুবই আদিম ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে তাদের শ্রমজীবন অতিবাহিত করে। তাদের কষ্টকর জীবনকে সহনীয় করতে কয়েকটি দিকে লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।

এক. শ্রমিকরা যা আয় করে আর তাদের ব্যায়ের মধ্যে এখনো সামঞ্জস্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। শহর এলাকায় শ্রমিকদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয় আবাসন খাতে। ঢাকা মহানগরে একজন গার্মেন্ট শ্রমিক তার আবাসন বাবদ প্রতি বর্গফুটে যে টাকা খরচ করে তা অনেকসময় মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাটবাড়ির চেয়েও বেশি। সরকারি-বেসরকারি-মালিকপক্ষের উদ্যোগে সাশ্রয়ীমূল্যে শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

দুই. শ্রমিকদের পুষ্টিমান নিশ্চিত করার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার পথ উদ্ভাবন করা দরকার। এক্ষেত্রে রেশন কার্ডপ্রথা চালু করা যেতে পারে।

তিন. বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গায় শিশুশ্রম চালু আছে। শিশুশ্রমিকদের পূনর্বাসন নিশ্চিত করে তাদের জীবনকে সহনীয় করা যেতে পারে।

চার. পরিবহণ ক্ষেত্রে শ্রমিকরা খুবই মানবেতর অবস্থায় কাজ করে। এই খাতে শ্রমিকদের কাজ বা চাকুরি একটা নিয়মনীতির আওতায় এনে ন্যূনতম মানবিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার।

পাঁচ. বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। সেই আয়ু যাতে সুন্দরভাবে মানুষ যাপন করতে পারে তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে দেশের জনগোষ্ঠির একটা বড় অংশ শ্রমিকদের জীবনমান মর্যাদাময় করার দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। এই কাজটি রাষ্ট্রকেই করতে হবে। রাষ্ট্রকে শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি মানবিক হতে হবে। শুধু মালিকপক্ষের স্বার্থ নিশ্চিত করার দিকে রাষ্ট্র মনোযোগি হয়ে উঠলে তাকে ন্যায্য রাষ্ট্র বলা যাবে না।

আমাদের শিল্পখাতে আমরা রাষ্ট্রকে বিনিয়োগ করতে দেখেছি শিল্প পুলিশের সৃষ্টি ও বিকাশে। শ্রমিকদের যে কোনো আন্দোলন দমনে এই রাষ্ট্রিকবাহিনী যথেষ্টই তৎপর। কিন্তু রাষ্ট্রকেও ভাবতে হবে, কেন শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম দাবি আদায়ে মাঠে নামে? শ্রমিকদের অভূক্ত রেখে, অসন্তুষ্ট রেখে, ক্ষুব্ধ রেখে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলবো তা কতিপয়ের রাষ্ট্র হতে পার কিন্তু তা সর্বসাধারণের রাষ্ট্র হবে না।

মে দিবসের লড়াই ছিল সর্বসাধারণের জন্য এক মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ নিশ্চিত করার শ্রমিকশ্রেণীর লড়াই। সে লড়াই এখনো চলমান। তাই মে দিবসের তাৎপর্য আজও গুরুত্ববহ।

শুভ কিবরিয়া : সাংবাদিক, কলামিস্ট; নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।