কাজী আরিফকে শেষ শ্রদ্ধা




কাজী আরিফকে শেষ শ্রদ্ধা

স্টার বাংলা ডেস্ক: আশির দশকে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বনি-তরঙ্গে যে শহীদ মিনার প্রাঙ্গন প্রকম্পিত করেছিলেন, সেই শহীদ মিনারেই রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধায় ও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শেষযাত্রায় চললেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের অগ্রসেনা আবৃত্তিশিল্পী মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফ।

মঙ্গলবার সকালে কাজী আরিফের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। মরদেহের সঙ্গে ছিলেন তার বাবা কাজী আজিজুল ইসলাম, মেয়ে অন্তরা বিনতে আরিফ, অনুসূয়া বিনতে আরিফ ও ছেলে তেপান্তর আরিফ।

বেলা পৌনে ১২টার দিকে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন আসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপরই তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানো হয়।

এই পর্বে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনিসহ রাজনীতি, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।

এরপরই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় নাগরিক শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে মেয়ে অন্তরা বিনতে আরিফ জানান, মঙ্গলবার বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তার ধানমণ্ডির বাসায়। সেখানে পরিবারের সদস্যরা তাকে শ্রদ্ধা জানাবেন। বাসাতেই ফ্রিজিং ভ্যানে রাখা হবে মরদেহ।

তাদের আরেক বোন আনুশকা বিনতে আরিফ দেশের বাইরে থেকে ফিরবেন মঙ্গলবার রাতে। তারপর বিকাল ৩টায় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

অন্তরা বলেন, বাবার শেষযাত্রায় প্রতিটি ধাপে মানুষের এত ভালোবাসা পেয়েছি, আমরা পরিবারের প্রতিটি সদস্য সত্যি আপ্লুত হয়েছি। আপনারা সবাই দোয়া করবেন আমরা যেন বাবার মতো হতে পারি। বাবা যদি কাউকে বকা দেন, কিছু মনে করবেন না। সে বকা ছিল আদরের বকা। আপনারা সবাই বাবার হাসিমুখটি মনে রাখবেন।

কাজী আরিফের বাবা কাজী আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি আমার ছেলের পরিচয়ে পরিচিত ছিলাম। সেই ছেলে আমার হারিয়ে গেছে। সে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে, তার জন্য আমিও মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শুরুতে প্রথমেই তথ্য মন্ত্রণালয় ও পরে জাসদের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সঙ্গে ছিলেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার। পরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আসাদুজ্জামান নূর।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে এসে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বললেন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এক নতুন মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আবৃত্তিকে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠায় যারা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রথম সারির সৈনিক ছিলেন কাজী আরিফ। আবৃত্তির মধ্য দিয়ে তিনি দেশ ও মাটির কথা বলতেন। দেশের প্রতিটি অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত থেকে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সচেতন ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র ত্যাগ করেও কিন্তু অস্ত্র ত্যাগ করেননি কাজী আরিফ। আবৃত্তিকে অস্ত্র হিসেবে নিয়ে তিনি এক নতুন মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান তৈরি করেছিলেন। আবৃত্তি শিল্পের বিকাশে তিনি তৈরি করেছিলেন এক নতুন সম্ভাবনা।

শ্রদ্ধা জানায় বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, কণ্ঠশীলন, মহিলা আওয়ামী লীগ, মহিলা পরিষদ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, উদীচী, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী প্রভৃতি।

কাজী আরিফের জন্ম ১৯৫২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, রাজবাড়ী সদরের কাজীকান্দা গ্রামে। বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রাম শহরে। কলেজ জীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত কাজী আরিফ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন। ১ নম্বর সেক্টরে মেজর রফিকুল ইসলামের কমান্ডে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে বুয়েটে লেখাপড়ায় ফেরেন কাজী আরিফ। সমান তালে চলতে থাকে তার শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।

১৯৭৩ সালে প্রথম বিটিভি ও বেতারে আবৃত্তি করলেও কাজী আরিফের প্রথম অ্যালবাম ‘পত্রপুট’ বের হয় ১৯৮০ সালে। মোট ১৭টি কবিতার অ্যালবাম বেরিয়েছে তার।

মুক্তকণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা কাজী আরিফ বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।