বেরোবিতে সাত বছরেও শেষ হয় না স্নাতক




বেরোবিতে সাত বছরেও শেষ হয় না স্নাতক

স্টার বাংলা ডেস্ক: ভয়াবহ সেশনজটের কবলে ক্যাম্পাস জীবন যেন শেষ হচ্ছে না বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের। সেশনজটের ফাঁদে বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকাংশ বিভাগ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাড়ে ৯ হাজার ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। বয়স হারিয়ে চাকরির বাজারে তাল মেলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে ভোগান্তি ও যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে সেশনজট। চার বছরের নির্ধারিত স্নাতক কোর্স শেষ করতে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই বছর। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ সেশনজট নিরসনে তার আন্তরিকতার কথা জানান।

তিনি বলেন, নতুন করে সেশনজট তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেটা রয়েছে তা কমিয়ে শূন্যের কোটায় আনা হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেশনজটের শীর্ষে রয়েছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, গণিত বিভাগ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, রসায়ন বিভাগ, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইংরেজি বিভাগ, বাংলা বিভাগ, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। এক থেকে আড়াই বছরের অধিক সময় সেশনজটে রয়েছে এসব বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

বেশিরভাগ বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনও শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি। পড়ে আছেন স্নাতকে পর্যায়েই।

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা জানান, সাড়ে ছয় বছরে কেবল ষষ্ঠ সেমিস্টারে চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে তাদের। তারপর শুরু হবে ল্যাব চূড়ান্ত পরীক্ষা। বিভাগটির অন্যান্য ব্যাচের চিত্র প্রায় একই।

প্রায় একই অবস্থা গণিত বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের। নির্দিষ্ট সময়ে স্নাতক সম্পন্ন হলে ২০১৫ সালের মধ্যেই শেষ হত স্নাতকোত্তর। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। এখন চলছে স্নাতক সপ্তম সেমিস্টারের ক্লাস। একইভাবে চলছে বিজ্ঞান অনুষদের অন্যান্য বিভাগ।

এদিকে সেশনজট বেড়েই চলছে কলা অনুষদের তিনটি বিভাগে। এ অনুষদে সেশনজটে শীর্ষে রয়েছে ইংরেজি বিভাগ। বিভাগটির ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীরা এখনও কেবল ষষ্ঠ সেমিস্টারে। তবে এক বছরের সেশনজট নিয়ে এক সেমিস্টার এগিয়ে রয়েছে ওই শিক্ষাবর্ষের বাংলা এবং ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে প্রায় এক থেকে দেড় বছরের সেশনজটে রয়েছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, অর্থনীতি বিভাগ, সমাজবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন বিভাগ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ। এই অনুষদের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের স্নাতক শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিভাগ রয়েছে সপ্তম সেমিস্টারে।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার মাস আগে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তবে এখনও ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় স্নাতকোত্তরে ভর্তি হতে পারছেন না ব্যাচটির শিক্ষার্থীরা।তবে তুলনামূলকভাবে অন্যান্য অনুষদ থেকে এগিয়ে রয়েছে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগ। ছয় থেকে নয় মাসের সেশনজটে রয়েছে অধিকাংশ বিভাগ।

বেশিরভাগ বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনও শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি। যেখানে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া চুকিয়ে ফেলেছে, সেখানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভুগছে মনস্তাত্ত্বিক রোগে।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চার বছরের স্নাতক এবং এক বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স শেষ করতে লেগে যাচ্ছে সাত-আট বছর। যেখানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ হতে সময় লাগার কথা পাঁচ বছর।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, মূলত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবীণ শিক্ষক না থাকায় ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত নবীন শিক্ষকরা। প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করলে একাডেমিক কার্যক্রমে উদাসীন তারা। ফলে শিক্ষকদের মধ্যে বাড়ছে আন্তঃকোন্দল। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের গলার কাঁটা সেশনজট নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই তাদের।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদারকির অভাব, জবাবদিহিতা না থাকা ও স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি, বিভিন্ন পদের জন্য ক্লাস ফাঁকি দিয়ে লবিংয়ে ব্যস্ত থাকা। পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন, বহিঃপরীক্ষণ ও অন্য অফিশিয়াল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ জটিলতা এবং স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে নিয়মমাফিক ক্লাস-পরীক্ষার রুটিন না থাকাই সেশনজটের অন্যতম কারণ।

একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষকদের হাতে থাকা ৫০ নম্বর। এর কারণে শিক্ষার্থীরা নম্বর কম পাওয়ার ভয়ে শিক্ষকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। একই কারণে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলনে নামানো হয় বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চার বছরের স্নাতক এবং এক বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করতে সময় লাগছে সাত-আট বছর। ফলে পড়ালেখা থেকে অনেকটা ছিটকে পড়েছি। শিক্ষকদের একগুঁয়েমির কারণে আমাদের জীবন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে পিছিয়ে পড়ছি আমরা।

বেরোবি শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান প্রধান বলেন, শিক্ষক স্বল্পতা সেশনজটের অন্যতম কারণ। অধিকাংশ বিভাগেই পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষকরা অধিক বিষয়ে পড়াতে হচ্ছে। ফলে আপ্রাণ চেষ্টা করে শিক্ষকরা সেশনজট কমাতে পারছেন না।

প্রায় একই ধরনের কথা বলেন বেরোবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড.আবু সালেহ মোহাম্মদ ওয়াদুদুর রহমান। তিনি বলেন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার করে এবং ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিভাগ পরিচালনা করতে পারলে সেশনজট নিরসন করা সম্ভব।

সেশনজট নিরসনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ইতোমধ্যে সেশনজট নিরসনে দ্রুত ফল প্রকাশসহ একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের সঠিক সময়ে ক্লাস-পরীক্ষা সম্পন্ন করলে সেশনজট নিরসন সম্ভব বলে জানান তিনি।